• রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বুর্জোয়া শাসক শ্রেণি ও সরকারের পররাষ্ট্র নীতি:

ভারসাম্যের নামে সাম্রাজ্যবাদ-অধীনস্ততায় দরাদরির কৌশল

বুর্জোয়া শাসক শ্রেণি ও সরকারের পররাষ্ট্র নীতি:

ভারসাম্যের নামে সাম্রাজ্যবাদ-অধীনস্ততায় দরাদরির কৌশল

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে বিকশিত করা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি জোট ক্ষমতায় এসেছে। তারা ক্ষমতায় গিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ও সেনা সমর্থিত ইউনূস সরকারের মতোই সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনস্ততার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছে। এরই অংশ হিসেবে তারা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে আপসের নীতিও চালাচ্ছে, যদিও বর্তমানে সেটা হাসিনা-আওয়ামী সরকারের ভারতীয় চাকরের ভূমিকা থেকে কিছুটা পৃথক। কিন্তু সেটা তারা করছে কোনো স্বাধীন ভূখণ্ডে পা রেখে নয়, বরং মার্কিন ও চীনা সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভর করে, তাদের সাহায্যের ভরসা করে। 

ইউনূসের তৃতীয় শক্তির সরকার (তাদের মূল মিত্র জামাত-এনসিপিদের মদদে) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে দাসখতমূলক বাণিজ্য চুক্তি, বন্দর চুক্তি– এগুলো রেখে গেছে যা বর্তমান বিএনপি সরকারের হাত-পা বেঁধে রেখেছে। একইসাথে তারা মুখে ভারত-বিরোধী স্লোগান দিয়েছিল আর অন্যদিকে ভারতের সাথে সম্পাদিত বিবিধ বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও বহাল রেখেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের না আছে এগুলো থেকে বের হবার সামর্থ, না আছে তার কোনো পরিকল্পনা বা কর্মসূচি। 

উপরন্তু এখন তারা চীনা সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, এলএনজি টার্মিনাল তৈরি, চীনা জেট বিমান ক্রয়, মার্কিনের থেকে বোয়িং কেনা– এসব নতুন নতুন সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তারা সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর গার্মেন্ট শিল্পকে অর্থনীতির মূল এক স্তম্ভ হিসেবেই চালাচ্ছে। এবং সাম্রাজ্যবাদের বিশ্ব-অর্থনৈতিক পরিকল্পনাধীন রেমিটেন্স অর্থনীতিকেও ভিত্তি করে চলেছে। এভাবে তারা পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ধারাবাহিকতাই রক্ষা করে চলেছে। এখন ভারতের সাথে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার কথা বলছে জনমতের চাপে, বিরোধী বুর্জোয়াদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য, বিশেষত ভারত-হাসিনা-আওয়ামী ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করার জন্য, ভারতের সাথে দরাদরির জন্য।

মার্কিনের সাথে বাণিজ্য চুক্তি মোতাবেক একেবারে অপ্রয়োজনীয় ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় কিনতে যাচ্ছে সরকার। যা এদেশের কৃষি খাতে বাজেটের দেড় গুণের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং-এর নিম্নমানের সেবা নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই বিরাট অর্থের বিনিময়ে বোয়িং কেনা মার্কিনের দাসত্বের নজির মাত্র। 

২৫ আগস্ট’২৬ চীনের যুদ্ধ বিমান কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ। চীনের ঋণ পাওয়া বা তিস্তা প্রজেক্টের জন্য চীনের সহায়তা, এমনকি ভারতের সাথে দরাদরির জন্য চীনকে তাদের প্রয়োজন। এটা ছিল মার্কিনের উপর একক নির্ভরতার প্রশ্নে দরাদরির শক্তি বৃদ্ধির কৌশল। কিন্তু সাথে সাথেই তারা মার্কিন চাপেও পড়ে। তাকে তারা মোকাবেলা করে মার্কিনের থেকে আরো ১১টি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

এভাবে সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদের জালে দেশকে তারা আরো বেশি করে জড়িয়ে ফেলেছে।

ইরানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী অন্যায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্য জাহাজ চলাচলে বাধা প্রদান করলে বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, এমনকি মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রেও। দালাল সৌদি আরবের বাণিজ্য সংকট তৈরি হয়। লোহিত সাগরে বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে বিকল্প জাহাজ চলাচল পথে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সামরিক হামলা চালায়। তাই, বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন পরিকল্পনায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১৪-দেশীয় সামরিক নৌ-জোট গঠিত হয়েছে। তাতে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। ইরানবিরোধী একটি সামরিক জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ নিরপেক্ষতার নীতিকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে মার্কিনের বশংবদে পরিণত হয়েছে। এভাবে মার্কিন বিরোধীদের বাংলাদেশের শত্রুতে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্ব জনগণের দুশমন মার্কিনের আজ্ঞাবহ ভূমিকা কোনো গণতান্ত্রিক সার্বভৌম রাষ্টের্র পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না। অথচ এই চুক্তি নিয়ে জনগণকে জানানো দূরের কথা, তাদের সংসদে পর্যন্ত অনুমোদন নেয়া হয়নি। আর এ সত্ত্বেও জামাত-এনসিপি একে বিরোধিতা দূরের কথা, লংমার্চে একে কোনো কর্মসূচি করা দূরের কথা, জামাত আমির প্রকাশ্যে এইসব সামরিক চুক্তিকে সমর্থন করেছে।

শুধু তাই নয়, মার্কিন দালাল সৌদি আরব ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র, ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক এবং সাম্রাজ্যবাদের আরেক দালাল পাকিস্তানকে নিয়ে ৩-দেশীয় যে সামরিক জোট ‘মক্কা জোট’ গঠিত হয়েছে, তাতেও নব্য পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যোগ দেবার খায়েশ প্রকাশ করেছেন। আর জামাত-আমির একে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে।

মক্কা জোটকে আবর্তিত করে এ সরকার তথাকথিত ভারতবিরোধী রাজনীতির বয়ান তৈরি করছে। এদেশের জনগণের ন্যায়সংগত ভারত বিরোধী মনোভাবকে নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহারের পাঁয়তারা করছে। তারা বলছে ভারত এদেশে আক্রমণ চালালে এই জোট বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াবে। এটা একটা প্রতারণামূলক বয়ান। বরং এ জোটের নেতা সৌদি আরব ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট  কসাই মোদীকে সৌদির সর্বোচ্চ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।

এভাবে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তাদের রাষ্ট্র ও সরকার সাম্রাজ্যবাদীদের বিবিধ আঞ্চলিক যুদ্ধ ও বিশ্ব-যুদ্ধের প্রস্তুতির মধ্যে দেশকে নিয়ে ফেলেছে, যার ভবিষ্যত পরিণতি খুবই মারাত্মক হতে পারে। দেশের জনগণকে এ সম্পর্কে দ্রুত সচেতন হতে হবে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ-তৎপরতায় আমাদের দেশকে ঢুকিয়ে দেয়ার এসব ষড়যন্ত্রকে রুখে দেয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। 

মার্কিনের এই নগ্ন দালালিতে চীনা সাম্রাজ্যবাদ যাতে নাখোশ না হয় সেজন্য তাকে হাতে রাখার কিছু ব্যবস্থাও এ সরকার নিচ্ছে। কারণ, ভারতের বিরোধিতার জন্য তাদের আবার চীনের খুঁটি দরকার। এ বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়ে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহায়তার বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা ও সম্মতি জ্ঞাপন করে এসেছে। চীন থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে অপ্রয়োজনে বিশটি যুদ্ধ বিমান কেনার চুক্তিও করে ফেলেছে। চট্টগ্রামে চীনা অর্থায়নে ইপিজেড শিল্প নগরী গড়ে তুলছে এবং বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে  চীনের অর্থনৈতিক করিডোর সরকার বিবেচনা করছে।

ভারত-হাসিনা একদিকে বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে, অন্যদিকে বিএনপি সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। বিএনপি সরকারও ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টায় রয়েছে (সর্বশেষ, মোদির জন্মদিনে তারেক রহমানের শুভেচ্ছাবাণী পাঠানো)। কিন্তু জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাব, বিশেষত বিরোধীদলগুলোর ভারত বিরোধী ইস্যুকে কাজে লাগানোকে অগ্রাহ্য করতে পারছে না। ফলে বিএনপি সরকারও ভারতের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করার কথা বলছে। কিন্তু বিবিধভাবেই প্রমাণ হয়েছে ভারত সরকার হাসিনার প্রশ্নে তাদের মূল নীতি ঠিক রাখবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। বিএনপি সরকার তারেক রহমানের ভারত সফর পিছিয়ে দেয়াটা বিরাট ভারত-বিরোধী, দেশপ্রেমিক কাজ হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছে। সত্যিই কি এ সরকার ভারত বিরোধী, জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী! নাকি হাসিনাকে নিয়ে মোদি সরকার যে ট্রাম্পকার্ড খেলছে তাতে নিজেদের ভারতবিরোধী হিসেবে দেখানো এবং জনগণের সেন্টিমেন্ট বিরোধীদলকে ব্যবহার করতে না দেয়ার কৌশল। এ সরকারও ভারতের সাথে করা অসম চুক্তিগুলো বাতিল করেনি, বরং তিন হাজার একর জমি বিনালাভে তুলে দিচ্ছে বিদ্যুৎ-করিডোরের জন্য। সীমান্ত হত্যা, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা না দেয়া, এদেশকে বন্যায় ভাসিয়ে দেয়া নিয়ে টু শব্দটিও করছে না। 

সরকারের দেশ ও গণবিরোধী চুক্তিগুলোতে ধর্মবাদী জামাত-জোট সম্মতি জ্ঞাপন করে যাচ্ছে। জামাত প্রধান শফিকুর রহমান-তো বলে বেড়াচ্ছে আমেরিকা তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। নির্বাচনের আগে জামাত, এনসিপি, বিএনপি  নেতারা প্রতিযোগিতা করে আমেরিকা, চীনসহ সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের আর্শ্বিাদ পাওয়ার জন্য শুধু দূতাবাস বৈঠকেই ক্ষান্ত থাকেনি। বরং সেসব দেশে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের পায়ের ধূলোও নিয়ে এসেছে। জনগণের সাথে প্রতারণামূলক ভাবে ভারতের সাথে করেছে গোপন সমঝোতা। 

হাসিনা সরকার নিজের ক্ষমতার স্বার্থে নগ্নভাবে ভারতের দালালি করে তার মাধ্যমে মার্কিনের সাথে সম্পর্ক রেখেছে। অন্যদিকে বিএনপি, জামাত-এনসিপি সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রাধান্য দেয় এবং ভারতের সাথে আপস নীতি বজায় রাখে। এরা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বর্তমানে চীন-রাশিয়া বনাম মার্কিন-পশ্চিমা আন্ত:সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের মাঝে মার্কিন-পশ্চিমাদের বলয়ে থেকে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’র বুলি আওড়ায়। এটা হাসিনা-আওয়ামী লীগের বিদেশি দালালির এক রকমফের মাত্র।

 দেশপ্রেমিক জনগণকে এই দাসত্বের বেড়াজাল ভাঙতে হলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লব করতে হবে এবং সে লক্ষ্যে এগিয়ে চলতে হবে।

বুর্জোয়া শাসক শ্রেণি ও সরকারের পররাষ্ট্র নীতি:

ভারসাম্যের নামে সাম্রাজ্যবাদ-অধীনস্ততায় দরাদরির কৌশল

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬  |  অনলাইন সংস্করণ

বৈদেশিক নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় অর্থনীতিকে বিকশিত করা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি জোট ক্ষমতায় এসেছে। তারা ক্ষমতায় গিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার ও সেনা সমর্থিত ইউনূস সরকারের মতোই সাম্রাজ্যবাদীদের অধীনস্ততার পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে চলেছে। এরই অংশ হিসেবে তারা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে আপসের নীতিও চালাচ্ছে, যদিও বর্তমানে সেটা হাসিনা-আওয়ামী সরকারের ভারতীয় চাকরের ভূমিকা থেকে কিছুটা পৃথক। কিন্তু সেটা তারা করছে কোনো স্বাধীন ভূখণ্ডে পা রেখে নয়, বরং মার্কিন ও চীনা সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভর করে, তাদের সাহায্যের ভরসা করে। 

ইউনূসের তৃতীয় শক্তির সরকার (তাদের মূল মিত্র জামাত-এনসিপিদের মদদে) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে দাসখতমূলক বাণিজ্য চুক্তি, বন্দর চুক্তি– এগুলো রেখে গেছে যা বর্তমান বিএনপি সরকারের হাত-পা বেঁধে রেখেছে। একইসাথে তারা মুখে ভারত-বিরোধী স্লোগান দিয়েছিল আর অন্যদিকে ভারতের সাথে সম্পাদিত বিবিধ বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও বহাল রেখেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকারের না আছে এগুলো থেকে বের হবার সামর্থ, না আছে তার কোনো পরিকল্পনা বা কর্মসূচি। 

উপরন্তু এখন তারা চীনা সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, এলএনজি টার্মিনাল তৈরি, চীনা জেট বিমান ক্রয়, মার্কিনের থেকে বোয়িং কেনা– এসব নতুন নতুন সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তারা সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর গার্মেন্ট শিল্পকে অর্থনীতির মূল এক স্তম্ভ হিসেবেই চালাচ্ছে। এবং সাম্রাজ্যবাদের বিশ্ব-অর্থনৈতিক পরিকল্পনাধীন রেমিটেন্স অর্থনীতিকেও ভিত্তি করে চলেছে। এভাবে তারা পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ধারাবাহিকতাই রক্ষা করে চলেছে। এখন ভারতের সাথে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার কথা বলছে জনমতের চাপে, বিরোধী বুর্জোয়াদের মুখ বন্ধ রাখার জন্য, বিশেষত ভারত-হাসিনা-আওয়ামী ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করার জন্য, ভারতের সাথে দরাদরির জন্য।

মার্কিনের সাথে বাণিজ্য চুক্তি মোতাবেক একেবারে অপ্রয়োজনীয় ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় কিনতে যাচ্ছে সরকার। যা এদেশের কৃষি খাতে বাজেটের দেড় গুণের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং-এর নিম্নমানের সেবা নিয়ে বহু অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই বিরাট অর্থের বিনিময়ে বোয়িং কেনা মার্কিনের দাসত্বের নজির মাত্র। 

২৫ আগস্ট’২৬ চীনের যুদ্ধ বিমান কেনার চুক্তি করে বাংলাদেশ। চীনের ঋণ পাওয়া বা তিস্তা প্রজেক্টের জন্য চীনের সহায়তা, এমনকি ভারতের সাথে দরাদরির জন্য চীনকে তাদের প্রয়োজন। এটা ছিল মার্কিনের উপর একক নির্ভরতার প্রশ্নে দরাদরির শক্তি বৃদ্ধির কৌশল। কিন্তু সাথে সাথেই তারা মার্কিন চাপেও পড়ে। তাকে তারা মোকাবেলা করে মার্কিনের থেকে আরো ১১টি বোয়িং কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

এভাবে সাম্রাজ্যবাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যবহার করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদের জালে দেশকে তারা আরো বেশি করে জড়িয়ে ফেলেছে।

ইরানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী অন্যায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্য জাহাজ চলাচলে বাধা প্রদান করলে বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়, এমনকি মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রেও। দালাল সৌদি আরবের বাণিজ্য সংকট তৈরি হয়। লোহিত সাগরে বাব আল-মান্দাব প্রণালী দিয়ে বিকল্প জাহাজ চলাচল পথে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সামরিক হামলা চালায়। তাই, বাব আল-মান্দাব প্রণালীতে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন পরিকল্পনায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১৪-দেশীয় সামরিক নৌ-জোট গঠিত হয়েছে। তাতে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশও। ইরানবিরোধী একটি সামরিক জোটে যোগ দিয়ে বাংলাদেশ নিরপেক্ষতার নীতিকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে মার্কিনের বশংবদে পরিণত হয়েছে। এভাবে মার্কিন বিরোধীদের বাংলাদেশের শত্রুতে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্ব জনগণের দুশমন মার্কিনের আজ্ঞাবহ ভূমিকা কোনো গণতান্ত্রিক সার্বভৌম রাষ্টের্র পররাষ্ট্রনীতি হতে পারে না। অথচ এই চুক্তি নিয়ে জনগণকে জানানো দূরের কথা, তাদের সংসদে পর্যন্ত অনুমোদন নেয়া হয়নি। আর এ সত্ত্বেও জামাত-এনসিপি একে বিরোধিতা দূরের কথা, লংমার্চে একে কোনো কর্মসূচি করা দূরের কথা, জামাত আমির প্রকাশ্যে এইসব সামরিক চুক্তিকে সমর্থন করেছে।

শুধু তাই নয়, মার্কিন দালাল সৌদি আরব ও ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র, ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক এবং সাম্রাজ্যবাদের আরেক দালাল পাকিস্তানকে নিয়ে ৩-দেশীয় যে সামরিক জোট ‘মক্কা জোট’ গঠিত হয়েছে, তাতেও নব্য পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যোগ দেবার খায়েশ প্রকাশ করেছেন। আর জামাত-আমির একে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে।

মক্কা জোটকে আবর্তিত করে এ সরকার তথাকথিত ভারতবিরোধী রাজনীতির বয়ান তৈরি করছে। এদেশের জনগণের ন্যায়সংগত ভারত বিরোধী মনোভাবকে নিজেদের গোষ্ঠীগত স্বার্থে ব্যবহারের পাঁয়তারা করছে। তারা বলছে ভারত এদেশে আক্রমণ চালালে এই জোট বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়াবে। এটা একটা প্রতারণামূলক বয়ান। বরং এ জোটের নেতা সৌদি আরব ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট  কসাই মোদীকে সৌদির সর্বোচ্চ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে।

এভাবে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তাদের রাষ্ট্র ও সরকার সাম্রাজ্যবাদীদের বিবিধ আঞ্চলিক যুদ্ধ ও বিশ্ব-যুদ্ধের প্রস্তুতির মধ্যে দেশকে নিয়ে ফেলেছে, যার ভবিষ্যত পরিণতি খুবই মারাত্মক হতে পারে। দেশের জনগণকে এ সম্পর্কে দ্রুত সচেতন হতে হবে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের যুদ্ধ-তৎপরতায় আমাদের দেশকে ঢুকিয়ে দেয়ার এসব ষড়যন্ত্রকে রুখে দেয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। 

মার্কিনের এই নগ্ন দালালিতে চীনা সাম্রাজ্যবাদ যাতে নাখোশ না হয় সেজন্য তাকে হাতে রাখার কিছু ব্যবস্থাও এ সরকার নিচ্ছে। কারণ, ভারতের বিরোধিতার জন্য তাদের আবার চীনের খুঁটি দরকার। এ বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়ে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে চীনের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহায়তার বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা ও সম্মতি জ্ঞাপন করে এসেছে। চীন থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়ে অপ্রয়োজনে বিশটি যুদ্ধ বিমান কেনার চুক্তিও করে ফেলেছে। চট্টগ্রামে চীনা অর্থায়নে ইপিজেড শিল্প নগরী গড়ে তুলছে এবং বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে  চীনের অর্থনৈতিক করিডোর সরকার বিবেচনা করছে।

ভারত-হাসিনা একদিকে বাংলাদেশ বিরোধী ষড়যন্ত্র করছে, অন্যদিকে বিএনপি সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। বিএনপি সরকারও ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টায় রয়েছে (সর্বশেষ, মোদির জন্মদিনে তারেক রহমানের শুভেচ্ছাবাণী পাঠানো)। কিন্তু জনগণের ভারতবিরোধী মনোভাব, বিশেষত বিরোধীদলগুলোর ভারত বিরোধী ইস্যুকে কাজে লাগানোকে অগ্রাহ্য করতে পারছে না। ফলে বিএনপি সরকারও ভারতের কাছে হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করার কথা বলছে। কিন্তু বিবিধভাবেই প্রমাণ হয়েছে ভারত সরকার হাসিনার প্রশ্নে তাদের মূল নীতি ঠিক রাখবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। বিএনপি সরকার তারেক রহমানের ভারত সফর পিছিয়ে দেয়াটা বিরাট ভারত-বিরোধী, দেশপ্রেমিক কাজ হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছে। সত্যিই কি এ সরকার ভারত বিরোধী, জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী! নাকি হাসিনাকে নিয়ে মোদি সরকার যে ট্রাম্পকার্ড খেলছে তাতে নিজেদের ভারতবিরোধী হিসেবে দেখানো এবং জনগণের সেন্টিমেন্ট বিরোধীদলকে ব্যবহার করতে না দেয়ার কৌশল। এ সরকারও ভারতের সাথে করা অসম চুক্তিগুলো বাতিল করেনি, বরং তিন হাজার একর জমি বিনালাভে তুলে দিচ্ছে বিদ্যুৎ-করিডোরের জন্য। সীমান্ত হত্যা, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা না দেয়া, এদেশকে বন্যায় ভাসিয়ে দেয়া নিয়ে টু শব্দটিও করছে না। 

সরকারের দেশ ও গণবিরোধী চুক্তিগুলোতে ধর্মবাদী জামাত-জোট সম্মতি জ্ঞাপন করে যাচ্ছে। জামাত প্রধান শফিকুর রহমান-তো বলে বেড়াচ্ছে আমেরিকা তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। নির্বাচনের আগে জামাত, এনসিপি, বিএনপি  নেতারা প্রতিযোগিতা করে আমেরিকা, চীনসহ সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের আর্শ্বিাদ পাওয়ার জন্য শুধু দূতাবাস বৈঠকেই ক্ষান্ত থাকেনি। বরং সেসব দেশে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের পায়ের ধূলোও নিয়ে এসেছে। জনগণের সাথে প্রতারণামূলক ভাবে ভারতের সাথে করেছে গোপন সমঝোতা। 

হাসিনা সরকার নিজের ক্ষমতার স্বার্থে নগ্নভাবে ভারতের দালালি করে তার মাধ্যমে মার্কিনের সাথে সম্পর্ক রেখেছে। অন্যদিকে বিএনপি, জামাত-এনসিপি সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে প্রাধান্য দেয় এবং ভারতের সাথে আপস নীতি বজায় রাখে। এরা সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বর্তমানে চীন-রাশিয়া বনাম মার্কিন-পশ্চিমা আন্ত:সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের মাঝে মার্কিন-পশ্চিমাদের বলয়ে থেকে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’র বুলি আওড়ায়। এটা হাসিনা-আওয়ামী লীগের বিদেশি দালালির এক রকমফের মাত্র।

 দেশপ্রেমিক জনগণকে এই দাসত্বের বেড়াজাল ভাঙতে হলে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বিপ্লব করতে হবে এবং সে লক্ষ্যে এগিয়ে চলতে হবে।

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র